শিরোনাম

ঘুরে আসুন বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী ‘জামাই মেলা’

বগুড়া প্রতিনিধি :
প্রতিবছরের মতো এবারও বগুড়া গাবতলীর মহিষাবান ইউনিয়নের পোড়াদহ এলাকায় দুই দিনব্যাপী ঐতিহ্যবাহী ‘জামাই মেলা’। সন্ন্যাসী পূজা উপলক্ষে ৪শ বছর আগে থেকে চলে আসা এই মেলা আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি (বুধবার) শুরু হতে যাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে এ মেলাকে অনেক নামেই ডাকা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, জামাই মেলা, বৌ মেলা, পোড়াদহ মেলা বা মাছের মেলা।

এ মেলার সময় আশেপাশের এলাকার মেয়ে আর জামাইকে দাওয়াত করে আনা হয়। তারপর মেলা থেকে বড় বড় মাছ কিনে, সেই মাছ জামাইকে খাওয়ানো হয়। এটা এখানকার দীর্ঘ দিনের প্রচলিত নিয়ম। এ কারণে এটাকে ‘জামাই মেলা’ বলা হয়।

মেলা হয় দুই দিনব্যাপী। দ্বিতীয় দিনকে বলে ‘বৌ মেলা’। এদিন কেবল বিভিন্ন গ্রামের নববধূরা এবং স্বামীর বাড়ি থেকে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসা মেয়েরা তাদের স্বামীদের সঙ্গে মেলায় আসেন। স্বামীদের নিয়ে সারাদিন তারা মেলায় ঘোরাঘুরি করেন ও সংসারের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিস কেনাকাটা করেন।

‘মাছের মেলা’ নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে বড় বড় মাছের ছবি। তবে এ ছবি কেবল কল্পনায় ধরা দেয় না। এমন কল্পনা বাস্তবে রূপ নেয় প্রতিবছর মাঘের শেষে অনুষ্ঠিত বগুড়ার পোড়াদহের ঐতিহ্যবাহী এই মেলায়। এখানকার অন্যতম আকর্ষণ বিভিন্ন প্রজাতির বড় বড় মাছ। একেকটা মাছ এতটাই বড় যে, চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। এর মধ্যে নদীর বড় বড় বাঘাইর, আইড়, বোয়াল, কাতলা, পাঙ্গাস, সামুদ্রিক টুনা, ম্যাকরেল ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেচাকেনা হয়। তবে, চাষের বিভিন্ন ছোট বড় আকারের মাছও পর্যাপ্ত পাওয়া যায়।

এ যেন কেবল একটি মেলা নয়, তার চেয়েও বেশি কিছু। মেলায় থাকে বড় বড় আর লোভনীয় মাছের বিশাল সংগ্রহ, বিকিকিনি, সংসারের যাবতীয় উপকরণ, বিনোদনের জন্য সার্কাস, নাগরদোলা, পালাগান ইত্যাদি। কিন্ত এসবকিছু ছাপিয়ে সারাদেশ থেকে আসা লাখো মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয় দুদিনের এই মেলা।

 

মেলা চলাকালে একসঙ্গে প্রচুর বড় ও জীবিত মাছ পাওয়া যায়। এলাকার অনেক মাছচাষি কেবল মেলায় অধিক লাভে বড় মাছ বিক্রির জন্য মাছ বড় করে তোলেন। তাছাড়া মেলায় বিক্রির জন্য বেশ আগে থেকেই নদীর বাঘাইর, আইড় ইত্যাদি মাছ স্থানীয় পুকুরগুলোতে বা অন্য জলাশয়ে বেঁধে রাখা হয়। আবার মেলা চলাকালে পার্শ্ববর্তী গোলাবাড়ী আড়তে আসা মাছবাহী গাড়ীগুলো সরাসরি মেলাতেই চলে আসে। মেলা থেকেই বাইরের বিক্রেতারা মাছ সংগ্রহ করেন। মেলার সময় অতিথি ও ঝি-জামাই আপ্যায়নের জন্য বড় মাছের ব্যাপক চাহিদা থাকায় গাবতলীর অন্যান্য বাজারেও বড় বড় মাছ পাওয়া যায়।

মেলায় কেবল যে মাছ পাওয়া যায় তা নয়, মাছ ছাড়াও কাঠের আসবাবপত্র, বাঁশ ও বেতসামগ্রী, লৌহজাত দ্রব্য, ফলমূল, নানা ধরনের মিষ্টি ও মিষ্টিজাত দ্রব্য এবং প্রচুর চুন পাওয়া যায়। এখানকার মিষ্টির আকারও বিরাট বড়। একেকটির ওজন এক থেকে দেড় কেজি পর্যন্ত। তাছাড়া মেলা উপলক্ষে বিনোদনের জন্য সার্কাস, নাগরদোলা ও পালাগানের আয়োজন করা হয়।

এ মেলা কবে থেকে শুরু হয়েছে, তার সঠিক দিনক্ষণ জানা যায়নি। তবে, এই মেলা নিয়ে একাধিক মিথ রয়েছে। বিভিন্ন সূত্র মতে জানা যায়, প্রায় ৪০০ বছর পূর্বে পোড়াদহ সংলগ্ন মরা মহিষাবান নদীতে প্রতিবছর মাঘের শেষ বুধবারে অলৌকিকভাবে বড় একটি কাতলা মাছ সোনার চালুনি পিঠে নিয়ে ভেসে উঠত। মাঘের শেষ বুধবারের এ অলৌকিক ঘটনা দেখার জন্য প্রচুর লোক জড়ো হতো। পরে স্থানীয় একজন সন্ন্যাসী স্বপ্নাদিষ্ট হয়ে অলৌকিক এ মাছের উদ্দেশ্যে অর্ঘ্য নিবেদনের জন্য সবাইকে উদ্বুদ্ধ করেন। সন্ন্যাসীর আহ্বানে সাড়া দিয়ে পোড়াদহ বটতলায় মাঘের শেষ বুধবারে অলৌকিক মাছের উদ্দেশ্যে স্থানীয় লোকজন অর্ঘ্য নিবেদন শুরু করেন। কালক্রমে এটি সন্ন্যাসী পূজা নামে পরিচিত হয়। পূজা উপলক্ষে এক সময় লোক সমাগম বাড়তে থাকে এবং ক্রমে বৃহদাকৃতির মাছ ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য মেলাটি প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে।

তবে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, পোড়াদহ মেলার এ স্থানটি একটি প্লাবনভূমি। ভৌগোলিকভাবে এটি নদী, খাল ও বিলের মোহনায় অবস্থিত। এখান থেকে খুব কাছেই আছে রানীরপাড়া মৌজাধীন কাৎলাহার বিল ও ঢিলেগারা বিলসহ পোড়াদহ খাল ও মরা মহিষাবান নদী। অতীতে এটি যমুনার সঙ্গে খুব ভালোভাবে সংযুক্ত ছিল। বর্ষাকালে বিভিন্ন নদী পথে এসব বিলে আসা প্রচুর মাছ এখানে থেকে যায়। জলবায়ুগত পরিবর্তনে মাঘের শেষে এখানকার পানি প্রায় শুকিয়ে গেলে তখন এখানে থেকে যাওয়া কোন বড় কাতলা মাছের বৃত্তাকার আঁইশ সোনার চালুনির মতো মনে হতে পারে। কেননা দেশি বড় কাতলা মাছের আঁইশ বেশ সোনালি বর্ণ ধারণ করে, অল্প পানিতে সাঁতরানো অবস্থায় রোদের ঝিলিকে তা কোনো ধ্যানমগ্ন সন্ন্যাসীর কাছে আরো আকর্ষণীয় স্বর্ণের চালুনির মতো মনে হতেই পারে।

সারাদেশ থেকে প্রচুর মানুষ এই মেলা দেখতে ভিড় করেন। আপনিও ঘুরে আসতে পারেন। ঐতিহ্যবাহী এই মেলায় যেতে চাইলে সড়ক পথে ঢাকা থেকে বাসে সাড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টায় বগুড়া চলে যান। বগুড়ায় নেমে বাসে বা অটোরিকশায় গোলাবাড়ি। এরপর আবার অটোরিকশা বা রিকশাযোগে পোড়াদহ মেলায় পৌঁছে যাবেন।

আপনার সময় কম থাকলে রাতের বাসে রওনা করে ভোরে বগুড়ায় পৌঁছে যাবেন। তারপর মেলায় সারাদিন কাটিয়ে দিন শেষে বগুড়া ফিরে রাতে আবার ঢাকার বাসে ফিরতে পারেন। তবে খেয়াল রাখবেন, এখন মাঘ মাস। বগুড়া অঞ্চলে প্রচণ্ড ঠান্ডা। সুতরাং পর্যাপ্ত শীতের কাপড় নিয়ে রওয়ানা করবেন।

Ad Widget

Recommended For You

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *