শিরোনাম

বিজয়ের খবর ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১

ঊষার বাণী : ১৭ ডিসেম্বর ২০২০
স্টাফ রিপোর্টার :

সাত কোটি বাঙালির স্বপ্নসারথি—৭১। এই বদ্বীপের মানুষের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামের নাম মুক্তিযুদ্ধ। ৩০ লাখ শহিদ ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে পেয়েছি স্বাধীনতা। আর হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মানেই বাংলাদেশ। দীর্ঘ নয় মাসের যুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাঙালি স্বাধীনতা অর্জন করে। এদিন পাকবাহিনী আত্মসমর্পণ করে মুক্তিকামী বাঙালির কাছে। তাদের এই আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে পাকিস্তানের দীর্ঘ দুই যুগের শাসন, শোষণ ও বঞ্চনার পরিসমাপ্তি ঘটে; নির্যাতন, নিষ্পেষণের কবল থেকে মুক্ত হয় বাঙালি জাতি।

১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ ঐহিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আঙুলের ইশারায় স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রস্তুতি তথা দিকনির্দেশনামূলক ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। এরপর থেকে পাকজান্তারা আলোচনার কথা বলে সময় ক্ষেপণ করতে থাকে। এই সময় ক্ষেপণের মধ্যেই তারা বাঙালির ওপর আক্রমণের প্রস্তুতি নিতে থাকে। এক পর্যায়ে ২৫ মার্চ রাতে তারা পৈচাশিক হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে। ওইদিন গভীর রাতে (২৬ শে মার্চ) গ্রেফতার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এই ঘোষণার পর নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শেষে ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ তথা বাঙালি জাতি অর্জন করে চূড়ান্ত বিজয়।

দীর্ঘ ৯ মাসের সংগ্রাম শেষে স্বাধীন মানচিত্র নিয়ে জেগে ওঠা বাংলাদেশের বিজয়কে ওই সময়ের দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পত্রপত্রিকা বিভিন্নভাবে তুলে ধরেছিল। কোনো-কোনো পত্রিকা বাংলাদেশের যুদ্ধকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করেছে, কোনো কোনো পত্রিকা দেখানোর চেষ্টা করেছে— এটি ছিল মূলত পাকিস্তানের বিপক্ষে ভারতের জয়। তবে শেষ তকমাটা বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের নামের পাশেই যোগ হয়েছে। অকুতোভয় বাঙালিদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের-ই জয় নিশ্চিত হয়েছে। বাঙালির বিরুদ্ধে নানান কূটনৈতিক তৎপরতা এ বিজয় রুখতে পারেনি।

মুক্তিযুদ্ধে বিজয় বাঙালির জীবনে আনন্দ নিয়ে এসেছিল সত্য, কিন্তু এর পেছনে ছিল মানুষের আত্মত্যাগের কাহিনী। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বরের পর ১৭ ডিসেম্বর থেকে বাংলাদেশের বিজয়ের সংবাদ প্রকাশিত হতে থাকে। তবে সেই সময় বিজয়ের খবরের পাশাপাশি মানুষের আত্মদানের গল্পগুলোও উঠে আসে। কিন্তু কেমন ছিল বিজয়ের সংবাদ? পাকসেনাদের আত্মসমর্পণের পর মুক্তিযুদ্ধের বিজয় সংবাদে মানুষ কীভাবে উদ্বেলিত হয়েছিল? কেমন করে উদযাপন করেছিল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ?— এগুলোই ছিল মূলত তখনকার পত্র-পত্রিকার খবর।

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশে বেশিরভাগ পত্রিকা প্রকাশ হয়নি। ওই সময়ের প্রধান দৈনিক ইত্তেফাক প্রকাশিত হয় বিজয়ের একদিন পর অর্থাৎ ১৭ ডিসেম্বর। এদিন পত্রিকাটির প্রধান শিরোনাম ছিল ‘দখলদার পাক-বাহিনীর আত্মসমর্পণ, সোনার বাংলা মুক্ত’। সংবাদের ভূমিকায় লেখা ছিল- ‘স্টাফ রিপোর্টার: সাবাস মুক্তিযোদ্ধা! বিগত ২৫শে মার্চের বিভীষিকাময় রাত্রির অবসান ঘটিয়াছে। দখলদার পাক-বাহিনী গতকাল (বৃহস্পতিবার) বাংলাদেশ সময় অপরাহ্ন ৫.১ মিনিটের সময় বিনাশর্তে আত্মসমর্পণ করিয়াছে; জন্ম লইয়াছে বিশ্বের কনিষ্ঠতম ও অষ্টম বৃহত্তম স্বাধীন ও স্বার্বভৌম রাষ্ট্র গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলা দেশ।’

সংবাদের বিস্তারিততে বলা হয়, ‘এই আত্মসমর্পণের ভিতর দিয়াই সোনার বাংলা এবং তার সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীর জীবন হইতে বিভীষিকাময় তিমিরের অবসান ঘটিয়াছে। রক্তস্নাত বাংলা দেশের পূর্ব দিগন্তে আজ স্বাধীনতার অম্লান সূর্য উদ্ভাসিত। আজিকার এই শুভলগ্নে আমরা স্মরণ করিতেছি সেইসব বীর মুক্তিযোদ্ধাকে যাঁরা সাড়ে সাত কোটি মানুষের প্রাণের দাবী আদায়ের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করিয়া দিয়াছেন, সান্ত্বনা দিতেছি সন্তানহারা মাকে, স্বামীহারা স্ত্রীকে, পিতৃ-মাতৃহারা এতিমের সন্তানদের। এই সংগে স্মরণ করিতেছি স্বাধীন বাংলাদেশের জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, যিনি আজকের এই মুহূর্তে পর্যন্তও পাক সেনাবাহিনীর কারাগারে অন্ধ-প্রকোষ্ঠে আটক। সাড়ে সাত কোটি মানুষ আজ তাই তাঁকে কাছে পাওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমাণ।’

এদিকে দৈনিক পাকিস্তান তার ১৭ ডিসেম্বর সংখ্যায় পত্রিকাটির নাম-ই পরিবর্তন করে ফেলে। ‘পাকিস্তান’ শব্দটিকে ক্রস চিহ্ন দিয়ে পাশে বাংলাদেশ লেখে তারা। ওইদিন পত্রিকাটির ব্যানার লিড ছিল, ‘জয় বাংলার জয়।’ সাব হেড ছিল- সোনার বাংলা আজ মুক্ত, স্বাধীনঃ জয় সংগ্রামী জনতার জয়।’ ওইদিন থেকে পত্রিকাটি দৈনিক বাংলাদেশ নামে প্রকাশিত হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে যার নাম হয় দৈনিক বাংলা।

এছাড়া বাংলাদেশের আরেক দৈনিক আজাদী তাদের ১৭ ডিসেম্বর সংখ্যায় ব্যানার লিড করে ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়।’ আর প্রথম পাতায় বক্স আইটেম ছিল ‘মুক্তি ও ভারতীয় মিত্র বাহিনীর নিকট বাংলাদেশ দখলদার পাক সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ।’ এছাড়াও বিশ্ব প্রতিক্রিয়াসহ বিজয়ের নানান খবর প্রকাশ করে তারা।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হয়। যেমন: ওই সময় আওয়ামী লীগের সাপ্তাহিক মুখপত্র হিসেবে বের হতো ‘জয়বাংলা’ পত্রিকা। কমিউনিস্ট পাটির মুখপত্র ছিল মুক্তিযুদ্ধ। এছাড়া কবি ও সম্পাদক সিকান্দার আবু জাফর বের করতেন অভিযান। এই পত্রিকাগুলো মুক্তিযুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিজয়ের পর ১৯ ডিসেম্বর ‘মুক্তিযুদ্ধ’ প্রকাশ করে ‘আনন্দে বেদনার সুর’ শিরোনামে একটি খবর।

বঙ্গবন্ধুর মুক্তি নিয়ে সংবাদে বলা হয়, ‘বাঙলাদেশের রাহুমুক্তিতে প্রতিটি দেশবাসী আনন্দে উদ্বেল হইয়া উঠিলেও এই আনন্দের মধ্যেই বাজিতেছে বেদনার সুর। বাঙলাদেশের জনগণের প্রিয় নেতা গণপ্রজাতন্ত্রী বাঙলাদেশের রাষ্ট্রপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমান আজ আমাদের মধ্যে নাই। তিনি কসাই ইয়াহিয়ার নির্জন কারাগারে বন্দী। তিনি কোথায় আছেন, কেমন আছেন, কেহ জানে না। শেখ সাহেবের অনুপস্থিতি সকল আনন্দ উৎসবকে ম্লান করিয়া দিতেছে।’

৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বর কুমিল্লার সাপ্তাহিক ‘আমোদ’-এ প্রকাশিত হয় ঢাকার বাইরে মফস্বলের শত্রুমুক্তির খবর এবং মানুষের আনন্দ-উল্লাসের চিত্র। কুমিল্লা মুক্ত হয়েছিল ৮ ডিসেম্বর। ১৬ ডিসেম্বর আমোদ-এ প্রকাশিত ‘বাংলার বিভিন্ন এলাকার সহিত কুমিল্লাও শত্রুমুক্ত’— সংবাদে বলা হয়, ‘গত ৮ই ডিসেম্বর বুধবার প্রত্যুষে শহরবাসী কুমিল্লা শহরকেও যেন হালকা, স্বচ্ছ ও পবিত্র বলিয়া দেখিতে পায়। এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই জানিতে পারে কুমিল্লা শহর শত্রুমুক্ত এবং মুক্তি ও মিত্র বাহিনী কুমিল্লা শহরে পৌঁছিতেছে। এই আনন্দে জনগণ আনন্দ উল্লাসে একে অন্যের সহিত আলিঙ্গন ও জয়বাংলা ধ্বনি দিতে থাকে।’

মুক্তিযুদ্ধের পুরো নয় মাস বাংলাদেশের পাশে থেকে বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ভারত। দেশটির সংবাদপত্রগুলোও গুরুত্ব দিয়ে নিয়মিত খবর প্রকাশ করে যুদ্ধের সময়। তাদের প্রধান সংবাদপত্রগুলোতেও যথেষ্ট গুরুত্ব পেয়েছিল বাংলাদেশের বিজয়ের খবর। ১৭ ডিসেম্বর কলকাতার দৈনিক যুগান্তরের লিড সংবাদ ছিল ‘রাহুমুক্ত বাংলাদেশ’। এ সংবাদে বলা হয়, ‘যে-মাটিতে পড়েছে শহীদের পূত শোণিতধারা, সে-মাটি নেবে না পিশাচের দূষিত রক্ত। তবে পাইকারী হারে ছাড়া পাবে না দেশদ্রোহী এবং সমাজদ্রোহী ঘাতকের দল। গণআদালতে তাদের বিচার অবশ্য কাম্য। যারা অপরাধী, তারা পেতে পারে না ক্ষমা— পেতে পারে না নিষ্কৃতি। যে-আগুন জ্বলছে আজ বাংলাদেশের বুকে, তা নিভানোর জন্যই দরকার উপযুক্ত বিচার। নইলে শান্ত হবে না বাঙালীর অশান্ত আত্মা। সত্য এবং ন্যায়ের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে না সমাজ।’

মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের শরণার্থীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল ত্রিপুরা রাজ্য। ওই রাজ্যের আগরতলা থেকে প্রকাশিত দৈনিক সংবাদ বাংলাদেশের বিজয়ের খবরের শিরোনাম করেছিল বেশ দীর্ঘ। ১৭ ডিসেম্বর পত্রিকার লিড শিরোনাম ছিল- ‘অবশেষে শত্রুসেনা নতজানু, আজন্ম লালিত সেই পবিত্র মুখ উদ্ভাসিত, বাঙলাদেশ শত্রুমুক্ত, মিত্র বাহিনীর কাছে দখলদার পাক সেনা বাহিনীর নিঃশর্ত্ত আত্মসমর্পণ, ঢাকা মুক্ত, নতজানু শত্রু সেনাপতি, সোনার বাঙলার শ্যামল প্রান্তরে মানুষের বিজয় বৈজয়ন্তী, মাতৃদেহে লক্ষ লক্ষ সন্তানের রক্তে কর্দ্দমাক্ত করে, বাঙলার বাতাসকে কান্নায় ভরিয়ে দিয়ে যে সেনাবাহিনী সভ্যতার বিজয় রথকে পিছিয়ে দেবার চেষ্টা করেছিল তারা আজ ক্ষমাপ্রার্থী, আজন্মলালিত স্বপ্নের সেই পবিত্র মুখ আজ উদ্ভাসিত, আজ আবার সেই নিঃশব্দ পাখীর কণ্ঠে গান, সেই পুণ্যতোয়া জীবনের আপ্লুত কলতান, কোটি প্রাণ আজ বাঙলার মুখ দেখেছে, আজ স্বজন হারানো শ্মশানে শত্রুর বহ্নিমান চিতা, বাঙলা আজ মুক্ত, ঢাকা আজ উন্মুক্ত।’

একইদিন আরেকটি সংবাদ ‘রাজধানী আগরতলায় বাঁধ ভাঙ্গা আনন্দের জোয়ার’র বিস্তারিততে বলা হয়, ‘২৬শে মার্চের মধ্যাহ্নে যে রাজধানী আগরতলা প্রবল বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল বাংলাদেশের বুকে জঙ্গী শাহীর উন্মত্ত বর্বরতার প্রতিবাদে, আজ পূর্ণ বিজয়ের আনন্দে সন্ধ্যার রাজধানী প্রাণোচ্ছ্বল। বাংলাদেশ মুক্ত, ঢাকা স্বাধীন স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের মুক্ত রাজধানী-আকাশবাণীর এই ঘোষাণাটি শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই শহর আগরতলায় উচ্ছ্বসিত আনন্দের স্রোত বয়ে যায়। আনন্দের প্রাবল্যে জনসাধারণ রাস্তায় বাজি ফাটিয়ে, জয় বাংলা ধ্বনি দিয়ে আকাশ কাঁপিয়ে তোলেন। অনেককেই উচ্ছ্বাসের কান্নায় প্রিয়জনদের মিষ্টি মুখ করিয়ে আলিঙ্গন করতেও দেখা যায়।’

ভারতের ইংরেজি দৈনিক দ্য লিবারেশন টাইমস তাদের প্রধান সংবাদে লেখে ‘পাকিস্তান বাংলাদেশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।’ দ্য ট্রিবিউন তাদের ব্যানার লিড করে, ‘বাংলাদেশ ফ্রিড’ অর্থাৎ বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত। সাব হেডে তারা বলে, ‘পাকিস্তানি আর্মির নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।’

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি পশ্চিম পাকিস্তানের পক্ষে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওই দেশটির বিখ্যাত পত্রিকা ‘দ্য নিউওয়ার্ক টাইমস’ ১৬ ডিসেম্বর কোনো খবর প্রকাশ করেনি। তবে ১৭ তারিখে সাইড স্টোরিতে তারা পাকিস্তানের আর্মিদের আত্মসমপর্ণের খবর ছাপে এভাবে- ‘ঢাকা ক্যাপচারর্ড: গানস কুইট ইন বেঙ্গলি এরিয়া, বাট ওয়ার গোজ অন অ্যাট ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট’ অর্থাৎ ঢাকা দখল: বাংলাদেশে অস্ত্র সমর্পণ করলেও পশ্চিমাঞ্চলে যুদ্ধ চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের দৈনিক দ্য ম্যানহ্যাটন মারকিউরি তাদের ১৬ ডিসেম্বর সংখ্যায় লিড স্টোরি করে ‘বাংলাদেশ ইজ বর্ন’ অর্থাৎ বাংলাদেশের জন্ম। দেশটির আরেক পত্রিকা দ্য পোস্ট ক্রিসেন্ট তাদের মূল নিউজটি করে বাংলাদেশের জন্ম নিয়ে। সেখানে তাদের মূল শিরোনাম ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ শেষ’। আর যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা রাজ্য থেকে প্রকাশিত ভিনসেন্স সান-কমার্শিয়াল জানায়, পাকিস্তান পূর্বাঞ্চলের সৈন্যদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। দেশটির ‘লস অ্যাঞ্জেলস টাইম’ তাদের প্রধান শিরোনাম করে, ‘নয়া দিল্লি পাকিস্তান যুদ্ধে জয়ী’। একইদিনের আরেক সংবাদে তারা বলে, ‘পাকিস্তানি জেনারেল সিং পূর্বাঞ্চলের সৈন্যদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।’

এদিকে ১৬ই ডিসেম্বর পশ্চিম পাকিস্তান বাঙালিদের কাছে আত্মসমর্পণ করলেও দেশটি বিখ্যাত দৈনিক ‘দ্য ডন’ তাদের ১৬ ডিসেম্বর সংখ্যায় লিড করে, ‘সিচ্যুয়েশন ইজ ক্রিটিক্যাল’ অর্থাৎ পরিস্থিতি জটিল। ১৭ ডিসেম্বরও তাদের লিড নিউজে দেখা যায় ‘জয় না আসা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাও’। ১৮ ডিসেম্বর তারা প্রধান শিরোনাম করে ‘ইয়াহিয়ার যুদ্ধবিরতির ঘোষণা।’

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পত্র-পত্রিকায় মুক্তিযুদ্ধের নানামাত্রিক খবর প্রকাশিত হয়েছিল। সেই সময় দেশি-বিদেশি খবরের কাগজ ভরে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের নানান খবরে। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পরবর্তী সময়ে পত্রপত্রিকাগুলোর খবর যেমন ছিল আনন্দের, তেমনি বেদনারও। তখনকার দিনে পত্রিকাগুলোর পাতায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে উঠে আসে- পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি বঙ্গবন্ধুর মুক্তি, বাংলাদেশ থেকে ভারতের সেনাবাহিনীর নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন, গণহত্যা-নির্যাতন তথা মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচার, বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গড়ে তোলা, দেশ পুনর্গঠন প্রভৃতি। ১৭ ডিসেম্বর এবং তার পরবর্তী কয়েকদিনের পত্রপত্রিকায় এসব বিষয়ই বিশেষভাবে স্থান পায়।

[তথ্যসূত্র: ১৯৭১ সালে প্রকাশিত দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পত্রিকা]

Ad Widget

Recommended For You

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *