শিরোনাম

একজন মা যখন কর্মজীবী

একজন নারীকে ক্ষেত্র বিশেষে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রুপ ধারন করতে হয়। কখনও সে মেয়ে, স্ত্রী, বোন এবং মা। শুধু নামে মাত্র মা নয়। সন্তানের জন্য একজন মা কখনো শিক্ষক, কখনো ডাক্তার, কখনও বন্ধু আবার কখনও সন্তানের আনন্দ আহ্লাদের স্থান।

কর্মজীবী নারী মানেই যে সে শুধু অফিস করবে, ঘরে ফিরে কিছু করবে না এমন তো নয়। অফিসের কাজের পাশাপাশি সে একজন গৃহিণী। তাকে অফিসের কাজ করে এসে ঘরের কাজ করতে হয়, পরিবারের সকলের খেয়াল রাখতে হয়, অফিস থেকে ফিরে চলে যেতে হয় রান্না ঘরে। একজন কর্মজীবী মা অন্য মায়েদের থেকে আলাদা নয়। একজন মায়ের জীবনের পুরো হৃদয়টা জুড়ে থাকে তার সন্তান। সন্তানকে একটা সুন্দর জীবন দেওয়ার জন্য পরিবারের বাবার পাশাপাশি একজন মা ও নিঃসার্থভাবে কষ্ট করে। শুধুমাত্র নিজের ফুর্তি বা ভালো লাগার জন্য সে কর্মজীবী হয় না। সে চায় তার পরিবারকে সহযোগীতা করতে, নিজেকে সাবলম্বী রাখতে তবে অবশ্যই সন্তানের কথা মাথায় রেখে।

দুঃখজনক হলেও সত্যি যে আমরা ধরেই নেই – কর্মজীবী মায়েরা কঠিন হৃদয়ের। সন্তানের প্রতি তাদের খেয়াল অনেক কম। কিন্তু কর্মজীবী হলেও সবকিছুর উর্দ্ধে সে একজন মা এটা আমরা কি বুঝতে চাই? নাকি বোঝার চেষ্টা করি? কিন্তু কর্মজীবী বলেই সে কঠিন হৃদয়ের সেটা ভাবা কতটুকু যৌক্তিক?

সময়ের পরিবর্তনে, এখন মানুষকে একইসাথে বিভিন্ন দিকে নজর রাখতে হয়, একসাথে অনেক গুলো কাজ করায় পারদর্শি হতে হয়। আর সেই মানুষটি যদি হয় একজন কর্মজীবী মা, তাহলে সেটা তারজন্য আরও বেশী কঠিন হয়ে যায় আরও বেশী চ্যালেঞ্জিং হয়ে যায়।

একজন কর্মজীবী মাকে কর্মস্থলেও নিজেকে দক্ষ কর্মী হিসেবে উপস্থাপন করতে হয়, আবার অন্যদিকে সংসার বিশেষ করে সন্তানের দিকেও পূর্ণ মনোযোগ দিতে হয়। কর্মজীবী মায়ের জন্য এটা একটা অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। অনেকেই এই চ্যালেঞ্জটা নিয়েও ব্যর্থ হয়ে যায় যদি তার পরিবারের সাপোর্ট না থাকে। কর্মজীবী মা হয়েও কর্মস্থলে কিভাবে সফল হবেন? সন্তানের কাছে কিভাবে সেরা মা হবেন ? এবং কিভাবে সংসার সামলাবেন সে বিষয়ে কিছু কথা বলি।

১। কর্মপরিকল্পনা তৈরী করাঃ
কর্মজীবী মায়েদের কাজের চাপটা একটু বেশী থাকে। কর্মস্থল, সংসার, সন্তান সবদিক সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করতে তাকে হিমশিম খেতে হয়। তাই তাকে একটি কর্ম পরিকল্পনা করতে হবে, কাজগুলোকে ছোট ছোট করে ভাগ করে নিতে হবে। এতে করে দৈনন্দিন কাজগুলো অনেক সহজ মনে হবে।

২। কর্মক্ষেত্রে কোনকিছু না লুকানোঃ
একজন নারী যখন মা হন তখন তাকে অনেক সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। আর মা যদি হন একজন কর্মজীবী তাহলে সমস্যা গুলো আরও তীব্র হয়ে যায়। তাই নিজের কাজ ও পরিবার নিয়ে কর্মস্থলে কোনকিছু না লুকিয়ে সরাসরি কথা বলা উচিত। এতে অনেক সমস্যারই সমাধান পাওয়া যাবে।

৩। কর্মস্থলে কাজের দক্ষতা প্রমাণ করাঃ
প্রতিটা নারীর জন্যই সংসার একটি বড় দায়িত্ব এবং সন্তান আরও বড় একটি দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে কর্মজীবী মাকে অনেক নতুন নতুন দক্ষতা অর্জন করতে হবে। একজন কর্মজীবী মাকে শুধু বাড়ীতে নয় মাঝে মাঝে কর্মস্থলেও অনেক কঠিন পরিস্থিতির মুখেমেুখি হতে হয়। অনেক সময় অফিস কর্তৃপক্ষ ধরেই নেন যে – কর্মজীবী নারীরা মা হবার পর সন্তানের জন্য অফিসে ঠিকমত কাজ করতে পারবেনা। তাই ইচ্ছার বাইরে যেয়েও মনটাকে শান্ত রেখে, মানসিক অবস্থাকে স্থির রেখে কাজ করতে হবে। কর্মস্থলে যেকোন সময় যেকোন কাজের জন্য নিজেকে প্রস্তুত রাখতে হবে, দক্ষতা গুলো কাজে লাগাতে হবে। তাহলে কাজ অনেক ভালো হবে।

৪। অন্যের কথায় কর্ণপাত না করাঃ
প্রশংসা যেমন মানুষের কাজের আকাঙ্খা বা পরিবেশ বাড়িয়ে দেয় ঠিক তেমনি নেতিবাচক কথা মানুষের কর্মস্পৃহাকে কমিয়ে দেয় মনটাকে খারাপ করে দেয়। কর্মজীবী মায়েদের অনেক নেতিবাচক কথা শুনতে হয়। যেমন – মা চাকরী করলে সে হয়ে যায় হৃদয়হীন, নিষ্ঠুর, বাচ্চার জন্য তার কোন মায়া মমতা নেই, ঐ সন্তান বড় হলে মায়ের কথা শুনবে না, সন্তান মানুষ হবে না, পড়ালেখা ভালো হবে না ইত্যাদি আরও কত কি। এইরকম যত কথাই আসুক না কেন, মন খারাপ করা যাবে না। সন্তানের কথা মাথায় রেখেই আপনাকে প্রমান করতে হবে যে, কর্মজীবী হলেও আপনি একজন মা এবং সবকিছু সুষ্ঠভাবে করার যোগ্যতা আপনার আছে।

৫। নিজের ইচ্ছাটাকে প্রাধান্য দিনঃ
একটা কথা সবসময় মনে রাখতে হবে যে, আপনার চাইতে আপনার সন্তানের ব্যাপারে অন্য কেউ ভালো জানবে না। যেকোন বিষয়ে পরামর্শ করতে হবে কিন্তু কেউ যদি তার সীমা ছাড়িয়ে যেতে চায় তবে তাকেও আপনার অবস্থানটা বোঝাতে হবে। আপনি কর্মস্থলে থাকা কালীন আপনার সন্তান কোথায় কার কাছে থাকবে, কি খাবে সেটা আপনাকেই ঠিক করতে হবে।

৬। নিজের মানসিক অবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করুনঃ
নিজের সাথে কথা বলুন। আপনি হয়তো কোন একটা কাজ ভালোভাবে করতে পারলেন না, তারমানে এটা দাড়ায় না যে আপনি কাজ ভালো পারেন না বা আপনি ভালো মা হতে পারেননি। তবে হ্যা, কেন এমনটা হলো সেটা বোঝার চেষ্টা করুন আর যেন এমনটা না হয় সেদিকে নজর দিন। সবসময় নিজের প্রতি বিশ্বাস রাখুন দেখবেন আপনি সংসার সন্তান কর্মস্থল খুব সুন্দভাবে ম্যানেজ করতে পারছেন।

সন্তানকে মায়ের মতো করে দেখাশোনা করা কারও পক্ষে সম্ভব নয়। সংসারে যত মানুষই থাকুক না কেন, মায়ের তুলনা শুধুই মা। একক পরিবার হলে, বাচ্চাকে যদি কাজের লোকের কাছে রাখতে হয় তাহলে তো ভরসা আরও কম। জীবন জীবিকার তাগিদে বাচ্চাকে বাসায় রেখে অফিস করলে কর্মজীবী মায়েদের মধ্যে একটা অপরাধবোধ কাজ করে। বাচ্চার মানসিক বিকাশ নিয়ে মায়ের চিন্তার শেষ নেই। চলুন কর্মজীবী মায়েদের জন্য আরও কিছু টিপস নিয়ে কথা বলি।

১। দিনের একটা দীর্ঘ সময় মা কাছে না থাকলে বাচ্চার মনের উপর একটা প্রেসার পরে, বাচ্চার মনে অভিমান বাসা বাধে। বাচ্চাকে বোঝাতে হবে যে, প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার মতো অফিসে যাওয়াও একটা কাজ। সম্ভব হলে তাকে মাঝে মধ্যে অফিসে নিয়ে যেতে পারেন যাতে করে ও অফিসের পরিবেশটা বুঝতে পারবে।

২। সবসময় কাছাকাছি না থেকেও যে ভালোবাসা মজবুত রাখা যায় সেটা আপনার সন্তানকে বোঝাতে হবে। ওকে শেখাতে হবে যে, বাবার মতো মায়ের অফিসে যাওয়াও স্বাভাবিক। এতে করে সন্তান যত বড় হবে আপনার কাজের গুরুত্ত¡ ওর কাছে বাড়তে থাকবে। সকালে নাস্তা খাওয়া থেকে শুরু করে স্কুলের জন্য রেডি হওয়া, স্কুলের টিফিন তৈরী করে দেয়া, স্কুলের হোম ওয়ার্ক করা এইসব বিষয়ে আপনার সন্তানকে সাহায্য করুন। স্কুল থেকে ফিরলে আপনি অফিস থেকে ফোন করে খোঁজ নিন, ওর বন্ধুদের খোঁজখবর নিন, ছুটির দিনে বন্ধুদের বাসায় ডাকুন, ওর পছন্দের খাবার রান্না করুন, আপনার অফিসের গল্প শোনান, আপনার ছুটির দিনে ওকে বাইরে ঘুরাতে নিয়ে যান। আপনার উপার্জন যে পরিবারের সকলের জন্য বিভিন্ন প্রয়োজন মেটায় সেটা ওকে বুঝাতে হবে।

৩। সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই নিজের কাজ নিজেকে করতে হয় সেই অভ্যাস গড়ে তুলুন। যাতে করে ও আপনার অনুপস্থিতি তেও নিজের কাপড়, খেলনা, বই পুস্তক গুছিয়ে রাখতে পারে এবং নিজের খাবার নিজেই নিয়ে খেতে পারে।

৪। অফিসে থাকলেও আপনি বারবার ফোন দিয়ে ওর খোঁজখবর নিন। ওকে বোঝাতে হবে যে, আপনি ওর কাছে না থাকলেও অফিস থেকেই ওর দেখভালো করছেন।

৫। বাসায় ফেরার পর সবকিছু বাদ দিয়ে ওর সাথে কিছু সময় কাটান আর এটা অবশ্যই করতে হবে। সারাদিন ও কিভাবে কাটালো জানতে চান, এতে করে সারাদিনের জমানো সব কথা ও আপনার সাথে শেয়ার করবে।

৬। জানতে চেষ্টা করবেন আপনার সন্তানের কি করতে ভালো লাগে এবং ভালো কাজের জন্য তাকে উৎসাহিত করবেন, ওর আত্নবিশ্বাস আরও বেড়ে যাবে।

৭। বাচ্চাদের মানসিক সুস্থতা পরিবেশের উপন নির্ভর করে। আতœীয় স্বজন ও প্রতিবেশীদের বাসায় বাচ্চাকে বেড়াতে নিয়ে যান। তাদের সাথে সম্পর্ক ভালো রাখুন, যাতে আপনার অনুপস্থিতে কোন সমস্যা হলে তারা এগিয়ে আসে।

৮। বাসায় আপনি না থাকলে কেউ আসলে যেন দরজা না খুলে, বাচ্চাকে সেটা বোঝান।

৯। বাসায় একটা ডায়রীতে প্রয়োজনীয় ফোন নম্বর গুলো লিখে রাখুন যাতে বিপদে কাজে লাগে। একটা ফাষ্ট এইড বক্সও রাখুন।

১০। খুব বিশ্বাসী আর পরিচিত না হলে কাজের লোকের কাছে আপনার বাচ্চাকে রাখবেন না। আর এটাও খেয়াল রাখতে হবে যে, আপনার সন্তান কাজের লোকের কাছে থাকতে চাচ্ছে কিনা বা তাকে পছন্দ করছে কিনা?

সবশেষে বলতে চাই, বাসা এবং কর্মস্থল সামলাতে গিয়ে একজন কর্মজীবী মা নিজের জন্যও যে কিছু সময়ের প্রয়োজন সেটা ভুলে যান, নিজের খেয়াল রাখতে ভুলে যান। নিজেকে সময় দিন নিজের যত্ন নিন। আপনার কাজের জন্যই আপনার নিজেকে সময় দিতে হবে না হলে নিজের মনের উপর চাপের সৃষ্টি হবে, হতাশা বিষাদ নিজেকে পেয়ে বসবে। এইসব সমস্যা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পরিবার পরিজনের সাথে গল্প করুন, গান শুনুন, মুভি দেখুন, ছুটিতে কোথাও বেড়াতে যান এগুলো আপনার মনকে শক্তি যোগাবে, ফ্রেস রাখবে। আপনি যদি মানসিকভাবে ভালো থাকেন তাহলে বাচ্চা এবং অন্যদের যতœ নিতে পারবেন সব কাজ ঠিকঠাক মত করতে পারবেন। মনে রাখতে হবে যে, আপনি মানসিকভাবে ভালো থাকলেই আপনার সন্তান ভালো থাকবে।

 

 

লেখিকাঃ নুরস্বেত জাহান নূপুর 

Ad Widget

Recommended For You

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *