শিরোনাম

বঙ্গবন্ধুর জীবনী আমাদের কাছে একটি শিক্ষার পাঠশালা

অধ্যাপক ড: সৌমিত্র শেখর

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন আপদামস্তক একজন কোমল মনের মানুষ। রাজনীতির পাশাপাশি শিক্ষা সংস্কৃতির প্রতি ছিল তার অঘাত কৃতজ্ঞতাবোধ। তিনি একাধারে ছিলেন রাজনৈতিক অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব অন্যদিকে সংস্কৃতিজন , সাংবাদিক। বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন দৈনিক ঊষার বাণীর স্টাফ রিপোর্টার শিপংকর শীল।

শিপংকর শীল : শিক্ষা ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর অবদান কেমন ছিল ?
অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর : বঙ্গবন্ধু ছিলেন শিক্ষার জন্য নিবেদিত প্রাণ। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য কলকাতা পর্যন্ত চলে গিয়েছিলেন এবং সেখান থেকে তিনি গ্রাজুয়েশন লাভ করেন। তিনি বাংলাদেশের যে কোন একটা কলেজেও পড়তে পারতেন। সেখানে তিনি পশ্চিমবঙ্গের ইসলামিয়া কলেজে পড়তে গেলেন যেটা বর্তমানে আজাদ কলেজ নামে পরিচিত। সেখানে পড়ার সময় জাতীয় অনেক নেতার সাথে তার পরিচয় হয়। তারপর তিনি রাজনীতির সাথে যুক্ত হলেন। শিক্ষার ডাকে তিনি দেশ ছাড়লেন এবং শিক্ষার জন্য তিনি ঘর ছাড়লেন।
১৯৪৭ সালে তিনি গ্রাজুয়েট হওয়ার সাথে সাথে ফিরে এলেন ঢাকাতেই, এবং ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। শিক্ষার জন্য তিনি ঢাকামুখী হলেন। তারপর শিক্ষা আন্দোলনের সাথে তিনি যুক্ত হলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বঙ্গবন্ধু একসময় এই ক্যাম্পাসে বিচরণ করেছিলেন, হাঁটতেন তাই আমি এখনো তার পদধ্বনী শুনতে পাই। এখন কল্পনা করি বঙ্গবন্ধু এ রাস্তা দিয়ে যেতেন এখানেই বক্তব্য রাখেতেন।

তারপরেই তিনি ভাষা আন্দোলনের সাথে যুক্ত হলেন। ভাষা আন্দোলন মূলত আমাদের শিক্ষা আন্দোলনের পূর্ব পদক্ষেপ। ১৯৪৮ সালের ৪ ঠা জানুয়ারি তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের জন্ম দিলেন এবং ১৯৫২ সালে তিনি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সাথে যুক্ত হলেন। এরপর তিনি চীন গেলেন এবং চীন দেশের যে শিক্ষা অথাৎ মাও ৎসে তুং এর বিপ্লবের পরিপ্্েরক্ষিতে সেখানকার পূর্বতন শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে যে নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা গঠন হল তা পর্যবেক্ষণ করলেন এবং সে সময়ে তার মনে আসার জাগরণ ঘটল যে- এরকম শিক্ষার আলো জনগণকে দিতে হবে। এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর শিক্ষা ব্যবস্থার গোড়াপত্তন। এভাবেই তার মধ্যে শিক্ষার বীজ, শিক্ষার পরিকল্পনা কাজ করছে ।

শিপংকর শীল : বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীতে সাহিত্যিক ভাব ছিল কিনা?
অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর: আত্মজীবনী হতে হবে ব্যক্তির আয়নায় প্রতীক এবং আন্তর্জাতিক ঘটনার প্রতিফলন। যেখানে লেখক নিজেই নিরাসক্ত দূরত্ব বজায় রাখবেন। কিন্তু নিজের জীবন এবং কর্মের পরমপরায় অন্যের জীবন এবং কর্মকেও প্রতিভাত করবেন। তাহলে এটি ব্যক্তিক হয়েও নৈবিত্তিক হয়ে উঠবে এবং সর্বজনীন হয়ে উঠবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী ব্যক্তিক গ্রন্থ হয়েও নৈবিত্তিক শিল্পকর্মে পরিণত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনীতে তিনি শুধু নিজের কথাই লিখেননি। নিজেকে কেন্দ্র করে পরিপার্শ্বকে লিখেছেন। সেখানে সমকালীন রাজনীতিকে তুলে ধরেছেন। তার সঙ্গে কার কার দেখা হয়েছিল সেটার শুধু সাধারণ বর্ণনা দেননি এর পরিপ্রেক্ষিতে কি ঘটেছিল তারও বর্ণনা দিয়েছেন। বিষয়গুলোকে তুলে ধরেছেন। সবমিলে রাজনীতি ,সংস্কৃতি, সাহিত্য, সাংবাদিকতা এবং নিজের শৈশব জীবন ও জেলের জীবনের কথা চুম্বকের মত উল্লেখ আছে ।
কোথাও অতিকথন নেই আবার কোন কিছুর অনুপস্থিত সেখানে নেই। এটি একটি সংহত আত্মজীবনী এবং অনুস্মরণীয়ও দৃষ্টান্তযুক্ত আত্মজীবনীতে পরিণত হয়।

শিপংকর শীল : বঙ্গবন্ধু রবীন্দ্রনাথকে কীভাবে দেখেছিলেন?
অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর : রবীন্দ্রনাথকে বঙ্গবন্ধু সবসময় কবিগুরু বলেছেন। কোন জায়গায় বঙ্গবন্ধু কবিগুরু কথাটি বাদ দিয়ে বলেননি। জনপদে বা ওই সময়ে পাকিস্তান রাষ্ট্রে রবীন্দ্রনাথের বিরোধিতা করা হচ্ছিল তখন বঙ্গবন্ধু সে সময়ে বক্তৃতায় কবিগুরু বলতে ভুলেননি। এছাড়া বঙ্গবন্ধু তার বক্তৃতায় না দেখে কবিগুরুর কবিতা উদ্ধৃত করছেন। এখনও অনেক শিক্ষক, ছাত্র, কবি, সাহিত্যিকদের কবিতা পড়তে হলে বই দেখে পড়তে হয় সেখানে বঙ্গবন্ধু মুখস্ত পাঠ করছেন। তার বক্তৃতায় তিনি ৪ লাইন, ৬ লাইন, ৮ লাইন মুখস্ত বলে যাচ্ছেন । শুধুমাত্র অনেক বেশি রবীন্দ্রনাথকে পড়লে বা ধারণ করলে এই রকমটা করা যায়।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার গ্রন্থে লিখেছেন, আমি এবং মা বাবার কাছে কিছু বই দিয়ে আসি জেল খানাতে এর বহু বই বাবা জেল থেকে আসবার সময় জেলের লাইব্রেরিতে দিয়ে আসতেন কিন্তু এর মধ্যে রবীন্দ্রনাথের সঞ্চয়িতা, জীবনানন্দের রূপসী বাঙলা, নজরুলের বই এবং শরৎচন্দ্রের বই তিনি ফেরত নিয়ে আসতেন। এতেই বোঝা যায় তিনি এই বইগুলো পাঠ করতেন। কারণ এগুলো তিনি লাইব্রেরিতে দিয়ে আসেননি।
শেখ হাসিনা লিখেছেন ওই বইগুলোর পাতা খেয়াল করলেই বুঝতে পারি আমার পিতা কতদিন জেলে কাটিয়েছে। রবীন্দ্রনাথকে বঙ্গবন্ধু প্রাণের ধূসর হিসেবে মনে করেছিলেন। আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি এর মধ্যে যে ঔদার্য এবং মমার্থ আছে সেটা তিনি মানুষকে বুঝিয়েছিলেন।
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সে সময়ে যে ষড়যন্ত্র হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর কথায় সেটা স্পষ্ট হয়। তিনি বলেছেন আমরা রবীন্দ্রনাথের কবিতার বই পড়ি, তার গান গাইবোই, রবীন্দ্রনাথের বাণী লইয়ায় বাঁচিয়া থাকিব- এ হল বঙ্গবন্ধুর মানসে রবীন্দ্রনাথের প্রতি ভালোবাসা।

শিপংকর শীল: বঙ্গবন্ধুর জীবনী থেকে আমরা কি শিক্ষা নিতে পারি?
অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর: বঙ্গবন্ধুর জীবনী হচ্ছে আমাদের কাছে একটি শিক্ষার পাঠশালা। বঙ্গবন্ধুর জন্ম থেকে শুরু করে তার সাড়ে ৫৪ বছরের জীবন। এই ৫৪ বছর জীবনের মধ্যে তিনি ১২ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। বাকি সময় মাঠে ঘাটে কর্মের মধ্য দিয়ে, সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রতি, ধনী দরিদ্রের মধ্যে সমন্বয়, ধর্মনিরপেক্ষ ,কর্মমুখী এবং উন্নত দেশ গড়ার প্রত্যয়ে তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। এই সবকিছুই বঙ্গবন্ধুর জীবন এবং দর্শন থেকেই আমরা পেয়ে থাকি।
বঙ্গবন্ধু তার পরিবারে কথা কখনও ভাবেননি। তিনি জনগণের জন্য রাজনীতি করেছেন। সে সময়ে শেখ কামাল বড় হচ্ছেন আর শেখ হাসিনার মুখে শেখ কামাল আব্বা ডাক শোনেন। সে সময়ে জেলখানা থেকে বঙ্গবন্ধু আসলেন শেখ হাসিনা আব্বা বলে জড়িয়ে ধরলেন।
শেখ কামাল শেখ হাসিনাকে বললেন হাসু আপু তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বু ডাকি।
তখন শেখ কামাল জানতই না বঙ্গবন্ধু তারই পিতা।
অথাৎ একটা পরিবার থেকে বঙ্গবন্ধু আনেকটা বিচ্ছিন্নই ছিলেন। তিনি কখনোই পরিবারের কথা ভাবেননি। তিনি জনগণের জন্য দিন ও রাতকে উৎসর্গ করেছেন। এই অবস্থার কারণেই বলব বঙ্গবন্ধুর জীবন থেকে আমাদের শিখতে হবে। বঙ্গবন্ধুর জীবনে কোন লোভ ছিল না। তিনি ছিলেন নিলোর্ভতার প্রতীক ।
একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপ্রতি থাকা অবস্থায়ও তিনি গণভবনে ছিলেন না। তিনি ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে ছিলেন। যে বাড়িকেই আমরা বলি বাঙালির তীর্থক্ষেত্র। হয়তো সে সময়ে তিনি গণভবনে থাকলে এ রকম হত্যাকাণ্ড ঘটত না। তিনি একটা ছোট বাড়িতে জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন। একজন জননেতা না হলে এটা ভাবাই যায় না।
বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে আমাদের শিক্ষা হচ্ছে আর্দশে শেষদিন পর্যন্ত জীবনকে উৎসর্গ করা, নিলোর্ভতা এবং জনগণের স্বার্থে নিজেকে উৎসর্গ করা। এটা যদি রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে প্রতিটি কর্মজীবী মানুষ ভাবেন তাহলে আমাদের দেশ সোনার বাংলা হতে বেশি সময় লাগবে না।

Ad Widget

Recommended For You

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *