শিরোনাম

বিলুপ্তির পথে গৃহবধূদের শীতল পাটি বুনন

ডেস্ক রিপোর্ট : ০৫-০৪-২০২২

শীতল পাটি গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্য। সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই গৃহবধূ ও কিশোরীদের শখের কাজ ছিল শীতল পাটি বুনন। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই রঙ-বেরঙের শীতল পাটি তৈরি হতো। এখনো গ্রাম-গঞ্জে শীতল পাটিতে বসিয়ে মিষ্টি খাওয়ানো ছাড়া নববধূকে ঘরে তোলা হয় না। কনের সঙ্গে তার শ্বশুর বাড়ির জন্য বিভিন্ন উপঢৌকনের সঙ্গে একটি শীতল পাটি দেয়ার নিয়ম এখনো অহরহ চোখে পড়ে। কালের বিবর্তনে আধুনিকতার ছোঁয়ায় গৃহবধূরা হয়েছেন সৌখিন। হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্য বহনকারী শীতল পাটি। সেই সাথে হারিয়ে যাচ্ছে এ পেশা।
স্থানীয়রা জানান, এক সময় গ্রামের বাড়িতে অতিথিরা এলে প্রথমেই বসতে দেওয়া হতো শীতল পাটিতে। গৃহকর্তার বসার জন্যও ছিল বিশেষ ধরনের সৌন্দর্যবর্ধক শীতল পাটি। আর তাই হাইমচরের বিভিন্ন গ্রামে প্রায় প্রতিটি বাড়িতে শীতল পাটি বুনন ছিল পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু এখন আর সেসব দেখা যায় না। বিবাহযোগ্য কন্যার পাটি বুনন জ্ঞানকে বিবেচনা করা হতো বিশেষ যোগ্যতায়। গরমে শীতল পাটির কদর ছিল বেশ। কেননা বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের রৌদ্রময় দুপুরে এই পাটি দেহ-মনে শীতলতা আনে। বর্তমান আধুনিকায়নে পাটি শিল্পের স্থান দখল করে নিয়েছে সুরম্য টাইলস, ফ্লোরম্যাট ও প্লাস্টিকসামগ্রী ও চাদর। বিভিন্ন গ্রামের বধূ-কন্যাদের নান্দনিক এ কারুকার্য এখন হারিয়ে গেছে সৌখিনতায়।
আব্দুল কাদির মিজির স্ত্রী হাসিনা বেগম জানান, শীতলপাটি বুনন ছিল তার পেশা। তিনি এ শীতলপাটিকে বাণিজ্যিকভাবে নিয়েছিলেন। হাতপাখা, নামাজের চিউনী, খাটে ঘুমানো পাটি বিক্রি করে তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন শীতল পাটির তেমন চাহিদা না থাকায় তিনি বুনন ছেড়ে দিয়েছেন। তার মতো শত শত নারীও ছেড়েছেন এ ‘শীতল পাটি’ বুনন। কারণ, পারিবারিক ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে পাটি বুনতাম, এখন আর এসব চলে না।
এই পাটির কিছু ঐতিহ্য ধরে রেখেছে ফেনীর সোনাগাজী, ফেনী সদর লেমুয়া ও পরশুরামের কয়েকটি গ্রাম এই সব গ্রামে প্রতিটি পরিবারই পাটি বানানোর পেশায় নিয়োজিত, বয়স্করা শীতল পাটি বানালেও কম বয়সিরা সাধারণ পাটি তৈরি করে। শত বছরের পুরনো ঐতিহ্য ধরে রেখেছে এখানকার কয়েকটি গ্রাম। এর মধ্যে অন্যতম পরশুরামের অনন্তপুর গ্রাম।
এই গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরে একই দৃশ্য চোখে পড়ে স্কুল পড়ুয়া কিশোরী থেকে শুরু করে মধ্যবয়সি ও বৃদ্ধা সবাই পাটি বানানোর কাজে ব্যস্ত থাকে। তাদের সঙ্গে পরিবারের পুরুষ সদস্যরা ও সমান তালে পাটি বানানোর কাজে ব্যস্ত থাকেন। এটা অনন্তপুর গ্রামের প্রায় সবকটি পরিবারের প্রধান পেশা পাটি বিক্রি করে, যা আয় হয় তা দিয়ে চলে তাদের সংসার ও ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার খরচ। পরশুরামের অনেক গ্রামে ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় সকলে হাতের মাপে পাটি বানায় ৪-৫ হাতের একটি সাধারণ পাটি ৫০০-৬০০ টাকা দরে বিক্রি করে একই মাপের একটি শীতল পাটি ৮০০-১০০০ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়। সাড়ে তিন হাত থেকে সাড়ে চার হাতের একটি পাটি ৪০০-৫০০ টাকা একই শীতল পাটির দাম প্রায় ৭০০-৮০০ টাকা দরে।
এক সময় দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন ব্যবসায়ীরা আসত, ফেনীর পরশুরামে শিতল পাটি কিনেতে। এখানকার লোকজনের অন্যতম পেশা ছিল পাটি বানানো। বর্তমানে পরশুরামের অনন্তপুর গ্রাম ব্যতীত অন্য কোনো গ্রামে পাটি বানানোর মতো লোক নেই বললেই চলে। শুধু পার্শ্ববর্তী কোলাপাড়া গ্রামের কিছু অংশে প্রায় অর্ধশতাধিক পরিবার পাটি বানানোর পেশায় রয়েছে। পর্যাপ্ত মোর্তাক গাছের উৎপাদন ও সরবরাহ না থাকায় পাটির উপযুক্ত মূল্য না পাওয়া এবং পাটির বিকল্প রেক্সিনের সহজ লভ্যতার কারণে পাটির চাহিদা কমে গেছে। এছাড়া সরকারি-বেসরকারি কোনো ধরনের সহযোগিতা না থাকায় পাটিশিল্প অনেকটা বিলুপ্তির পথে। এক সময় পরশুরাম বাজারে বিশাল একটি এলাকাজুড়ে শুধু পাটির বাজার বসত। অনন্তপুর গ্রামের রমেশ চন্দ্র নাথের ছেলে স্বপন নাথ (৫০) জানান, তিনি ও তার স্ত্রী দুজনে পাটি বানায় তাদের একমাত্র পেশাই এটা। তিনি জানান, আগে পরশুরামের অনেক গ্রামের লোকজন পাটি বানাত কিন্তু এখন পরশুরাম উপজেলার মধ্যে অনন্তপুর গ্রাম ছাড়া আর কোনো গ্রামে তেমন কেউ পাটি বানায় না। পর্যাপ্ত পরিমাণে মোর্তাক গাছের উৎপাদন না থাকায় পাটি পেশা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। তারা বলছেন সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা পেলে এই পাটিশিল্পকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা যাবে হয়তো।
অন্যদিকে, সরেজমিনে হাইমচরের চরভাঙ্গা, কৃষ্ণপুর, লামচরী ও মহজমপুর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, দুয়েকটি ঘরে শীতল পাটি থাকলেও নেই বুনন কার্যক্রম। এ পাটি বুননের জন্য ব্যবহৃত মোস্তাইক গাছের তেমন উৎপত্তি নেই। মূলত বেচাবিক্রি না থাকাতেই কারো যেন আগ্রহ নেই এসব শিল্প টিকিয়ে রাখার।
স্থানীয়রা জানান, শীতল পাটি তৈরির মূল উপাদান (কাঁচামাল) বেতি তৈরিতে অনেক পরিশ্রমের প্রয়োজন। পরিশ্রমের বিপরীতে বাজার দর ভালো না হওয়ায় দিন দিন একেবারে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন পাটি তৈরির কারিগররা।
এদিকে হাইমচর বাজার, হাওলাদার বাজার, চরভৈরবী বাজারের মাটির তৈজসপত্র বিক্রেতারা বলেন, একটি নামাজের পাটির দাম ২৫০ টাকা থেকে ৩০০ টাকা। অথচ ১২০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা খসালেই প্লাস্টিকের একটি নামাজের পাটি কেনা সম্ভব। আবার একটি বড় পাটির দাম ৮০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা। অথচ এর বিপরীতে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা দিয়ে প্লাস্টিকের পাটি বা ফ্লোরম্যাট কেনা সম্ভব। তাই বাজারে শীতল পাটির কিঞ্চিৎ চাহিদা থাকলেও বিকল্প পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় তা টিকছে না।

ঊষারবাণী/ এএইচ/ ২০২২

Ad Widget

Recommended For You

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *