
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার কারণে সৃষ্ট সংকট সমাধানে চীনের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের অবস্থানের ফলে দেশের অর্থনীতি, সমাজ, জনমিতি ও পরিবেশের ওপর যে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে, তা চীনের প্রতিনিধিদলের কাছে তুলে ধরেন তিনি।
আজ বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিসি) কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইশিংয়ের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে প্রধানমন্ত্রী এ সহযোগিতা কামনা করেন। প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন এ তথ্য জানান।
সাক্ষাৎকালে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের শুভেচ্ছা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে পৌঁছে দেন লিউ হাইশিং। জবাবে প্রধানমন্ত্রীও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংকে শুভেচ্ছা জানান।
লিউ হাইশিং বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বেইজিং সফরের সময় দুই দেশের ভবিষ্যৎ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন যুগের সূচনা নিয়ে একটি যৌথ ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ওই ঘোষণার আলোকে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো আরও সম্প্রসারিত হবে। বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে চীনের সমর্থন অব্যাহত থাকবে বলেও আশ্বস্ত করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের প্রতি চীনের অঙ্গীকার অপরিবর্তিত রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নের সম্ভাবনার প্রতিও চীনের আস্থা রয়েছে। ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর ও শক্তিশালী হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময়ে। দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের জনগণের হৃদয়ে এ সম্পর্ক বিশেষ স্থান দখল করে আছে। ঐতিহাসিক এ সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তা এগিয়ে নেওয়া বর্তমান নেতৃত্বের দায়িত্ব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নতুন প্রজন্মের হাত ধরে বাংলাদেশ ও চীনের বন্ধুত্ব এবং সহযোগিতার ঐতিহ্য আরও এগিয়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদী।
সাক্ষাৎকালে জিয়াউর রহমানের চীন সফরের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ওই সফরের পর বাংলাদেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়, যা পরবর্তী সময়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে এবং কৃষির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
তিনি জানান, বর্তমান সরকারও ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের উদ্যোগ নিয়েছে। এ কর্মসূচি কৃষক ও সাধারণ মানুষের উপকারে আসার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বৈঠকে চীনের কমিউনিস্ট পার্টি ও বিএনপির মধ্যে দলীয় পর্যায়ে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়। লিউ হাইশিং দুই দলের সম্পর্ক আরও বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এ সময় তিনি বিএনপির মহাসচিবের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদলকে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানান।
এ ছাড়া বৈঠকে বাংলাদেশ-চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা হয়। রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (আরসিইপি)-এ বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে চীনের সমর্থনের কথা জানান লিউ হাইশিং।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গার দীর্ঘদিনের উপস্থিতি বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে দেশের অর্থনীতি, সামাজিক কাঠামো, জনমিতি ও পরিবেশের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ তৈরি হচ্ছে। এ সংকটের টেকসই সমাধানে চীনের কার্যকর সহযোগিতা প্রয়োজন।
জবাবে লিউ হাইশিং বলেন, চীন রোহিঙ্গা সংকট সম্পর্কে অবগত রয়েছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উদ্বেগের কথা তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে অবহিত করবেন।
বৈঠকে চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগিতা অব্যাহত রাখা এবং দুই দেশের রাজনৈতিক দল ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সাক্ষাৎকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী, ভাইস চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আলতাফ হোসেন চৌধুরী এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম উপস্থিত ছিলেন।
চীনা প্রতিনিধিদলে ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ড. লিউ ইউয়িন, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক বিভাগের দক্ষিণ-পূর্ব ও দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ব্যুরোর মহাপরিচালক পেং শিউবিনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।