দৈনিক ঊষারবাণী
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ৮:২১ এএম
অনলাইন সংস্করণ
ভিউ: ৬১

মধুমতির ভাঙনে দিশেহারা মহম্মদপুরের নদীপাড়ের মানুষ

মধুমতির ভাঙনে দিশেহারা মহম্মদপুরের নদীপাড়ের মানুষ
প্রতিদিনই নদীগর্ভে যাচ্ছে বসতভিটা-ফসলি জমি, স্থায়ী বাঁধের দাবি

ইমরোজুল ইসলাম, মহম্মদপুর (মাগুরা):

মাগুরার মহম্মদপুরে বর্ষার পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভয়াবহ হয়ে উঠেছে মধুমতি নদীর ভাঙন। উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তীব্র স্রোতে প্রতিদিনই ভাঙছে নদীর পাড়। বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, বসতভিটা, গাছপালা ও বিভিন্ন স্থাপনা। ফলে নদীতীরবর্তী কয়েক হাজার মানুষ রয়েছেন চরম আতঙ্কে।

ভাঙনের কবলে পড়ে অনেক পরিবার ইতোমধ্যে বসতভিটা হারিয়েছেন। কেউ আশ্রয় নিয়েছেন আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে, কেউ আবার শেষ সম্বলটুকু রক্ষায় ঘরবাড়ি সরিয়ে নিচ্ছেন নিরাপদ স্থানে। নদীর পানি ও পাড়ের পরিস্থিতি দেখে অনেকেই রাত কাটাচ্ছেন উৎকণ্ঠায়।

মহম্মদপুর উপজেলার চরসেলামতপুর থেকে কালিশংকরপুর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ নদীতীরবর্তী এলাকায় ভাঙনের প্রভাব পড়েছে। গোপালনগর, মহেষপুর, হরেকৃষ্ণপুর, ঝামা, চরঝামা, আড়মাঝি, যশোবন্তপুর, চরপাচুড়িয়া, রায়পুর, মুরাইল, ধুপুড়িয়া, জাঙ্গালিয়া, রুইজানি, কাশিপুর, ধুলজুড়ি, দ্বিগমাঝি, দেউলি ও ভোলানাথপুরসহ প্রায় ২০টি গ্রামের মানুষ রয়েছেন ভাঙন আতঙ্কে।

স্থানীয়রা জানান, ভাঙনের কারণে শুধু বসতবাড়ি বা কৃষিজমিই নয়, ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, ঈদগাহ, মন্দির, বাজার ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। বছরের অন্যান্য সময়ে নদী শান্ত থাকলেও বর্ষা এলেই পাল্টে যায় এর চেহারা। পানির স্রোতের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে থাকে পাড় ভাঙার আশঙ্কা।

বালু উত্তোলন নিয়ে স্থানীয়দের ক্ষোভ

নদীভাঙনের জন্য অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনকেও দায়ী করছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, শুষ্ক মৌসুমে নদী থেকে যত্রতত্র বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশ ও গতিপথের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। বর্ষায় পানির চাপ বাড়লে সেই দুর্বল অংশগুলোতেই দেখা দিচ্ছে ব্যাপক ভাঙন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, প্রতি বছরই মধুমতির ভাঙনে নতুন নতুন এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একদিকে কমছে কৃষিজমি, অন্যদিকে বাড়ছে ভূমিহীন ও গৃহহীন মানুষের সংখ্যা। দ্রুত বালু উত্তোলন বন্ধের পাশাপাশি নদীভাঙন রোধে স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়ার দাবি তাদের।

ভাঙন এলাকা পরিদর্শনে ইউএনও

ভাঙনের পরিস্থিতি দেখতে গত ১৯ আগস্ট ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেন মহম্মদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বেদবতী মিস্ত্রী। এ সময় তিনি নদীভাঙন প্রতিরোধে প্রায় ৩০০ মিটার জিওব্যাগ ডাম্পিংয়ের এলাকা পরিদর্শন করেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর সঙ্গে কথা বলেন।

স্থানীয়দের সমস্যার কথা শুনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ও টেকসই ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।

‘বারবার বাড়ি সরিয়েও শেষ রক্ষা হচ্ছে না’

হরেকৃষ্ণপুর গ্রামের তহিদুল ইসলাম লিপন ও তার স্ত্রী নাসরিন সুলতানা জানান, নদীভাঙনে তাদের ১০ থেকে ১২ একর জমি ইতোমধ্যে নদীগর্ভে চলে গেছে। কয়েকবার বসতবাড়ি সরিয়ে নিতে হয়েছে। এবারও ভাঙনের আশঙ্কায় পাশের জমিতে অস্থায়ীভাবে ঘর তুলে বসবাস করছেন তারা। কখন সেই ঘরটিও নদীতে চলে যায়—এই দুশ্চিন্তায় কাটছে তাদের দিন-রাত।

একই গ্রামের নুর নাহার বলেন, “বর্ষা এলেই আমাদের ভয় শুরু হয়। এরই মধ্যে চারবার বাড়ি সরাতে হয়েছে। জমি, গাছপালা—সব হারিয়ে এখন কীভাবে থাকব, সেটাই বুঝতে পারছি না।”

ভ্যানচালক মো. ইনামুল শেখ বলেন, “নদীতে তিনবার বাড়ির ভিটা হারিয়েছি। এখন নিজের কোনো জায়গা নেই। অন্যের বাড়িতে ভাড়া থাকি। ভ্যান চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনো রকমে সংসার চলে।”

জিওব্যাগের পাশাপাশি স্থায়ী নদীশাসনের দাবি

স্থানীয়দের মতে, জিওব্যাগ ফেলে সাময়িকভাবে ভাঙন ঠেকানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এর সমাধান হবে না। প্রতিবছর বর্ষা এলেই নতুন করে ভাঙন শুরু হওয়ায় প্রয়োজন পরিকল্পিত নদীশাসন ব্যবস্থা।

ভাঙনকবলিত মানুষের দাবি, মধুমতির ভাঙন ঠেকাতে দ্রুত স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, কার্যকর নদীশাসন এবং অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে প্রতিবছরই নদীগর্ভে বিলীন হবে মানুষের শেষ আশ্রয়, বাড়বে গৃহহীন ও ভূমিহীন মানুষের সংখ্যা।

নদীপাড়ের মানুষের এখন একটাই প্রশ্ন—আর কত বসতভিটা ও ফসলি জমি হারালে মধুমতির ভাঙন ঠেকাতে স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া হবে?

এই পোস্টটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লগইন করলে আপনি মন্তব্য করতে পারবেন।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

আরও ১৪ সাংবাদিকের ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলব

1

জনবিচ্ছিন্ন হয়ে রাজনীতি করা যায় না -তথ্যমন্ত্রী

2

মুক্তমত প্রকাশ–সংক্রান্ত ও গায়েবি মামলা ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্

3

বাড়ির দোতলায়ও পানি, ভাই–বোনের খোঁজ পাচ্ছেন না গায়িকা পুতুল

4

সিরাজগঞ্জে ট্রেন লাইনচ্যুতি: ঘটনাস্থলে এসেছে উদ্ধারকারী ট্রে

5

প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তে ঘরে ঘরে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবে

6

প্রেস অ্যাক্রিডিটেশন নীতিমালা পুনর্মূল্যায়নে ১৭ সদস্যের কমিট

7

‘বিটিভি নিউজ’র যাত্রা শুরু

8

ক্যাম্পাসগুলোকে অশান্ত করলে সামাল দিতে পারবেন না— শিবির সভাপ

9

ভারতের সঙ্গে কথা হবে চোখে চোখ রেখে

10

বুবলীকে ‘পিনিক’–এ যেমন দেখা যাবে

11

যুক্তরাষ্ট্রে টিকটকে ঢুকলে দেখা যাচ্ছে নতুন বার্তা

12

মেহেরবানি করে চাঁদাবাজি করবেন না, রাজশাহীতে কর্মী সম্মেলনে জ

13

রমজান উপলক্ষে আরটিভির হিফজুল কোরআন প্রতিযোগিতার সিলেকশন রাউন

14

রিকশাচালককে গুলি করে হত্যা মামলায় কারাগারে চিকিৎসকসহ পাঁচজন

15

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তে আবার উত্তেজনা, হামলায় ৩ বাংলাদেশি

16

ছাত্রদলের হামলায় জকসুর ভিপি-জিএসসহ আহত ১৫, রেহাই পায়নি সাংবা

17

ঠাকুরগাঁওয়ে ইত্যাদির শুটিংয়ে কী ঘটেছিল, জানালেন হানিফ সংকেত

18

খায়রুল কবির খোকন বললেন, ‘তারেক রহমানই সরকার পতন আন্দোলনের মা

19

৫৩ বছর দেশ শাসনকারীরা নতুন আশা দেখাতে পারবে না: চরমোনাই পীর

20