সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা সর্বাত্মক অসহযোগ কর্মসূচি ঘিরে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট রাজধানীসহ সারা দেশে ব্যাপক সংঘর্ষ ও হতাহতের ঘটনা ঘটে। সেদিন দেশের অন্তত ৫০টি জেলায় সহিংসতা হয়।
আওয়ামী লীগ সরকার-সমর্থক নেতা-কর্মী ও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে সেদিন অন্তত ৯৮ জন নিহত হন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে বিক্ষোভকারীদের পাশাপাশি পুলিশ সদস্য এবং আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা–কর্মীরাও ছিলেন।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সমাবেশ থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ৩ আগস্ট (২০২৪) শেখ হাসিনা সরকারের পতন ও ফ্যাসিবাদের বিলোপের এক দফা ঘোষণা করেন। এই পরিস্থিতি সামাল দিতে ৪ আগস্ট আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক বৈঠকে রাজনৈতিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এই আন্দোলন দমনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
৪ আগস্ট দিনভর রাজধানী ছিল বিক্ষোভ আর সংঘর্ষের নগরী। যাত্রাবাড়ী, উত্তরা-আজমপুর, ধানমন্ডি, শাহবাগ, সায়েন্স ল্যাব, জিগাতলা, কারওয়ান বাজার, মিরপুর, গুলিস্তান, লক্ষ্মীবাজার, বাবুবাজার, রায়সাহেব বাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষে অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়। সেদিন ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলা শহরের চিত্রও ছিল অনেকটা একই।
মাগুরায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জেলা ছাত্রদলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসানসহ দুজন নিহত হন। নরসিংদীর মাধবদীতে আন্দোলনকারীদের দিকে গুলি ছোড়ার পর পাল্টা ধাওয়া হয়।
অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে মাঠে নেমেও আওয়ামী লীগ নেতা–কর্মীরা বিক্ষোভকারীদের থামাতে পারেননি; বরং বেশির ভাগ জায়গায় ছাত্র–জনতার প্রতিরোধের মুখে পিছু হটেন তাঁরা।
পরিস্থিতি সামাল দিতে তৎকালীন সরকার ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় সারা দেশে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করে। এ ছাড়া ৫ থেকে ৭ আগস্ট পর্যন্ত তিন দিনের (৫, ৬ ও ৭ আগস্ট) সাধারণ ছুটিও ঘোষণা করা হয়।
শুধু তা–ই নয়, সাত দিনের মাথায় এদিন দুপুর ১২টার পর সরকারি একটি সংস্থার নির্দেশে আবার ফোর–জি নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপের মতো সেবাও বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যে ৪ আগস্ট দেশের বিদ্যমান অবস্থায় সংকট নিরসনে করণীয় প্রসঙ্গে রাজধানীর রাওয়া ক্লাব মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তারা বলেন, ‘রাজনৈতিক সংকটকে সামরিকীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’ সামরিক বাহিনীকে ছাউনিতে ফিরিয়ে নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছিলেন সাবেক সেনা কর্মকর্তারা। এ ছাড়া এক রিটের শুনানিতে এদিন হাইকোর্ট বলেন, মানুষের জীবন ও মর্যাদা সুরক্ষার জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কেউ আইন লঙ্ঘন করলে পুলিশ বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাসের শেল এবং তারপর প্রাণঘাতী গুলির ব্যবহার করতে পারে। যদি আইন লঙ্ঘন না ঘটে বা কোনো দাঙ্গা না হয়, তবে কোনো প্রাণঘাতী গুলি (লাইভ বুলেট) ব্যবহার করা যাবে না।
৪ আগস্ট দুপুরে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ৬ আগস্ট ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি ঘোষণা করেন। সেদিন বিকেলে পৃথক বিবৃতিতে আরেক সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচি ৬ আগস্টের পরিবর্তে ৫ আগস্ট ঘোষণা করেন।
মন্তব্য করুন