একের পর এক নেতিবাচক ঘটনায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ভাবমূর্তি যখন তলানিতে, তখন খোদ ভিভিআইপি ফ্লাইট পরিচালনায় উঠে এসেছে ভয়াবহ গাফিলতির তথ্য। তাতে প্রশ্নের মুখে পড়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিরাপত্তা।
তারেক রহমানকে বহন করা তিনটি ফ্লাইটের নথি। যার একটি বাণিজ্যিক হলেও বাকি দুটি ভিভিআইপি ফ্লাইট। যেখানে উঠে এসেছেক্রুনির্বাচন, নিরাপত্তা ছাড়পত্র ও কারিগরি ত্রুটি নিয়ে গুরুতর গাফিলতির তথ্য।
ভিভিআইপি ফ্লাইটের নিয়ম অনুযায়ী, ককপিটে একজন ইন্সট্রাক্টর ক্যাপ্টেন, একজন লাইন ক্যাপ্টেন ও একজন ফার্স্ট অফিসার থাকা বাধ্যতামূলক। তবে, গত ৯ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে ভিভিআইপি ফ্লাইটে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় ফেরেন, তাতে এই নিয়ম মানা হয়নি। কক্সবাজার-চট্টগ্রাম সফর শেষে, প্রধানমন্ত্রী বিজি-৬১৮ নামে যে ফ্লাইটে ঢাকায় ফেরেন, সেখানে লাইন পাইলট আব্দুর রহমান আখন্দকে পাইলট ইন কমান্ড করা হয়। যা বিমানের ভিভিআইপি ম্যানুয়ালের লঙ্ঘন। তারচেয়েও ভয়ংকর বিষয় হলো, ক্যাপ্টেন আব্দুর রহমান আখন্দের বিমান চালনার লাইসেন্সের বৈধতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।
এমন ভয়াবহ ঘটনার পর তদন্ত না করেই উল্টো ক্যাপ্টেন আব্দুর রহমান আখন্দকে গেল ১৯ আগস্ট করা হয়েছে ডেপুটি চিফ অব ট্রেনিং। এসব বিষয়ে জানতে স্টার নিউজ যোগাযোগ করে, বিমানের ফ্লাইট অপারেশন্সের পরিচালক ক্যাপ্টেন এ কে এম আমিনুল ইসলামের সঙ্গে।
তিনি বলেন, ইন্সট্রাক্টর পাইলট থেকে ক্লিয়ারেন্স না আসলে আমরা কাকে দিয়ে ফ্লাইট করাব? আমাদের তো ফ্লাইট করাতে হবে, তাই না? এর আগেও এরকম হয়েছে, যে সুপারভাইজার পাইলট দিয়ে অনেক ফ্লাইট হয়েছে। এটাই প্রথম হয় নাই। হ্যাঁ, আর এমনি সব ফ্লাইটই এক, মানে সব ফ্লাইটই একই।
পরে তিনি খুদে বার্তায় জানান, বিমানের এমডি ও সিইওর সম্মতিতেই ফ্লাইটটি পরিচালিত হয়েছে। নিয়ম ভেঙ্গে কেন বিমানের এমডি সেই ফ্লাইট পরিচালনায় সম্মতি দিলেন, তা জানতে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও এমডিকে পাওয়া যায়নি। পরে প্রশ্ন পাঠালেও কোন ধরনের সাড়া মেলেনি।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক আবু রুশদ বলেন, প্রধানমন্ত্রী দেশের একজন ভিভিআইপি। উনি বিমানে উঠবেন, তার আগে তার পাইলটের সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স বাতিল করে দিলো, আরেকজন পাইলট চালিয়ে নিয়ে আসলেন। এটা কীভাবে সম্ভব? এই যে পাইলট এরকম হলো, বিমানেরও তো একটা কমিটি আছে। তারা কি করেছে? তারাও তো তাদের দায়িত্ব পালন করেনি। এখন গোয়েন্দা সংস্থা তো বিমানের কাছ থেকে লিস্ট নিয়েছে। আপনি জিনিসটা চিন্তা করেন। তাহলে বিমান কি করেছে? বিমান এত ক্যাজুয়ালি যাচ্ছে কেন?
এই ঘটনাই প্রথম নয়। এর আগে চলতি বছরের ২১ জুন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরের ফ্লাইটটিও উড়েছিল কারিগরি ত্রুটি নিয়ে। সেই ফ্লাইটের রক্ষণাবেক্ষণ নথিতেই মিলেছে এই তথ্য।
সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, ওড়ার ঠিক আগে বিমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থায় ত্রুটি ধরা পড়ে। তবে নথি অনুযায়ী, ফ্লাইট বিলম্ব এড়াতে সেটি ঠিক না করেই বিমানটি ওড়ার অনুমতি দেয়া হয়। ফলে প্রশ্ন উঠেছে- প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী একটি ভিভিআইপি ফ্লাইটে নিরাপত্তাজনিত ত্রুটি ধরা পড়ার পরও কেন ব্যবস্থা না নিয়ে সেটি পরিচালনা করা হলো?
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) মফিজুর রহমান বলেন, সাধারণ ফ্লাইটে অনেক কিছু ইগনোর করা গেলেও ভিভিআইপি ফ্লাইটে সেটা করা যায় না। যেখানে একটা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নির্বাহীই যাচ্ছে, সেখানে আমাদের কোনো রকম অবহেলা করার সুযোগ নেই। তো এটা যদি হয়ে থাকে, সেটার জন্য প্রয়োজনীয় তদন্ত করে যারা দোষী তাদের কিন্তু বিচারের আওতায় আনা উচিত বলে আমি মনে করি।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার (অব.) এটিএম নজরুল বলেন, প্রোটোকল মেইনটেইন করে যদি যেতে হয়, তাহলে অবশ্যই এয়ারলাইন্সকে সেই প্রোটোকল ফলো করতে হবে। এটা সিকিউরিটির ব্যাপার, কারণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ভ্রমণ করছে। এখানে প্রোটোকল ভাঙার কোনো সুযোগ নেই। এবং যদি এই প্রোটোকল ফলো না করে, তাহলে তো তাদের অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে।
এবার আরেকটু পেছনে ফেরা যাক। গত বছর ২৫ ডিসেম্বর গণঅভুত্থানের পর তারেক রহমান ঢাকায় ফেরেন বিমানের বিজি-২০২ ফ্লাইটে। সেই ফ্লাইটটির ইঞ্জিনের বৈদ্যুতিক স্টার্টারে তিন বার ত্রুটি ধরা পরে। প্রতিবারই তা সমাধান না করে পুরো যন্ত্রটিই পরিবর্তন করে দেয়া হয়। সেই ঘটনায় বিমানের তদন্ত কমিটি বলছে, এতে ফ্লাইটটিতে বড় ধরনের সিস্টেম সমস্যা, তেল লিক, গিয়ারবক্সের ক্ষতি বা আগুনের ঝুঁকির সম্ভাবনা ছিল।
প্রতিবেদনে রক্ষণাবেক্ষণ ক্রটির কথা বলা হলেও ফ্লাইটটির ব্যবস্থাপনায় জড়িত প্রকৌশলীদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা তো নেয়াই হয়নি, উল্টো এক সদস্য সাইফুজ্জামান খানকে পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়ার ফ্লাইটের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল।
প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী ভিভিআইপি ফ্লাইটে নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই। কিন্তু আমাদের হাতে আসা নথিতে কমপক্ষে দুটি ভিভিআইপি ফ্লাইটেক্রুনির্বাচন, কারিগরি ত্রুটি ও দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে গুরুতর গাফিলতির চিত্র উঠে এসেছে। প্রশ্ন হলো- যেখানে ভিভিআইপি ফ্লাইটেই বিমান নিয়ম মানছে না, সেখানে কিভাবে সাধারণ যাত্রীরা বিমানের উপর আস্থা রাখবে?