মো : জাহেদী আরমান
প্রকাশ : ৬ নভেম্বর ২০২৬, ৬:৪৪ পিএম
অনলাইন সংস্করণ
ভিউ: ১০

৭ নভেম্বর: জাতীয় ঐক্য ও নতুন রাজনৈতিক পথচলার সূচনার দিন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি তাৎপর্যপূর্ণ ও বহুল আলোচিত দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সংঘটিত সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান দেশের ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং পাল্টাপাল্টি অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হয় বাংলাদেশ। এ ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রে উঠে আসেন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল বাংলাদেশের মানুষ। স্বাধীনতার পর নতুন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই দেশকে মোকাবিলা করতে হয় গভীর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক বিপর্যয়, রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত হওয়ার অভিযোগ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে জনমনে তৈরি হয় হতাশা ও অসন্তোষ। এর সঙ্গে যুক্ত হয় রাজনৈতিক সংঘাত এবং সামরিক বাহিনীর অভ্যন্তরীণ টানাপোড়েন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এরপর ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত অভ্যুত্থানে তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান গৃহবন্দি হন। রাষ্ট্রক্ষমতা ও সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে শুরু হয় নতুন সংঘাত।

এই পরিস্থিতিতে ৭ নভেম্বর ভোরে সেনাবাহিনীর একাংশের সদস্যদের বিদ্রোহ এবং জাসদের গণবাহিনীর সংশ্লিষ্টতায় সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। মুক্ত হন জিয়াউর রহমান। ক্ষমতার পালাবদলে পতন ঘটে খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার। ওই দিন সামরিক ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে নতুন মোড় নেয় দেশের ইতিহাস।

৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলেন খালেদ মোশাররফ, কর্নেল আবু তাহের এবং জিয়াউর রহমান। কর্নেল তাহের ও জাসদের একটি অংশ এই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা করলেও শেষ পর্যন্ত জিয়াউর রহমানই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন। পরবর্তী সময়ে তাহেরের সঙ্গে জিয়ার রাজনৈতিক ও সামরিক বিরোধ তীব্র হয়। ১৯৭৬ সালে সামরিক আদালতে বিচারের পর কর্নেল তাহেরের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। পরবর্তী সময়ে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং অর্থনীতি, প্রশাসন ও রাজনৈতিক কাঠামোয় বিভিন্ন পরিবর্তন আনেন।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কার্যক্রমও নতুন গতি পায়। ক্ষুদ্রঋণ ও গ্রামীণ উন্নয়ন কার্যক্রমের বিস্তারে এ সময়ের নীতিগত পরিবেশ ভূমিকা রাখে।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও আসে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কার্যত একদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বহুদলীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম পুনরায় সম্প্রসারিত হয়। আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিজস্ব পরিচয়ে রাজনীতি করার সুযোগ ফিরে পায়। জামায়াতে ইসলামীর মতো দলও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ফেরার সুযোগ পায়। তবে এই রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস নিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে বিতর্কও রয়েছে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও তখন বিশ্বজুড়ে সামরিক শাসন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছিল। লাতিন আমেরিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সামরিক অভ্যুত্থান এবং কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিস্তার ঘটছিল। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনায় সামরিক নেতৃত্বের উত্থান এবং পরবর্তী সময়ে নির্বাচনী রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন ছিল উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

জিয়াউর রহমান পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন এবং রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার শাসনামলে বহুদলীয় রাজনীতি, অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির বিকাশ ঘটে। তবে তার ক্ষমতায় আসার প্রক্রিয়া, সামরিক শাসন, রাজনৈতিক বিরোধীদের প্রতি আচরণ এবং পরবর্তী রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো নিয়ে ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে।

সব মিলিয়ে ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের ইতিহাসে কেবল একটি সামরিক অভ্যুত্থানের দিন নয়; এটি রাষ্ট্রক্ষমতার পরিবর্তন, রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় কাঠামো গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। দিনটি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যাখ্যা ও মূল্যায়নে পার্থক্য থাকলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

(লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও অ্যাডজাঙ্কট ফ্যাকাল্টি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি)

এই পোস্টটি শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

ফেসবুক অ্যাকাউন্টে লগইন করলে আপনি মন্তব্য করতে পারবেন।
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

জনবিচ্ছিন্ন হয়ে রাজনীতি করা যায় না -তথ্যমন্ত্রী

1

চাপে মন্ত্রীরা, আসছে আরও রদবদল

2

তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া নিয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান

3

ওয়েজবোর্ড বাস্তবায়নে উদ্যোগ নেবে সরকার - তথ্য ও সম্প্রচার প্

4

বিরোধী দল না এলেও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধন হবে: স

5

দুর্গাপূজার মণ্ডপে ‘ঘুমহীন প্রহরী’ হয়ে থাকবেন বিএনপির নেতাকর

6

শরীয়তপুর সাংবাদিক সমিতির সভাপতি পলাশ, সম্পাদক মামুন

7

দ্বিতীয় পদ্মা ও যমুনা সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার

8

আমাদের জীবিত কিংবদন্তি দিলারা জামান...

9

কোনো সভ্য দেশে কূটনৈতিক স্থাপনায় এ ধরনের হামলা হতে পারে না

10

আন্তর্জাতিক বাজারে কৃষিপণ্য রপ্তানিতে নতুন সম্ভাবনা, দেশে চা

11

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ‘গোপন রাজনীতি’ নিষিদ্ধের দাবি জানাল ছাত্রদ

12

ভূমিকম্প মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিত ক

13

রিকশাচালককে গুলি করে হত্যা মামলায় কারাগারে চিকিৎসকসহ পাঁচজন

14

প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিদায়ী নৌবাহিনী প্রধানের সাক্ষাৎ

15

১৪তম আন্তর্জাতিক কৃষি প্রযুক্তি মেলা-২০২৬ উপলক্ষ্যে প্রধানমন

16

সেমিকন্ডাক্টর খাতের বিকাশে টাস্কফোর্স গঠন, সদস্য ১৩ জন

17

সাংবাদিকতা পেশায় রাজনৈতিক দলবাজি বন্ধ করা দরকার: সংস্কার কমি

18

মামলাজট নিরসনে মধ্যস্থতা কার্যক্রম আশাব্যঞ্জক ফল দিচ্ছে -আই

19

আগামীকাল উদ্বোধন জুলাই স্মৃতি জাদুঘর

20