মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া ও অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়তে নতুন কর্মপরিকল্পনা তৈরি করছে সরকার। এ পরিকল্পনায় কারিগরি প্রশিক্ষণ, বিদেশি ভাষা শিক্ষা, ক্ষুদ্র ব্যবসার জন্য প্রাথমিক তহবিল এবং অকৃতকার্য বিষয়ে তিন মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহদী আমিন জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় শিক্ষামন্ত্রী এবং সব শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সচিবদের সঙ্গে আলোচনা করে এ কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হচ্ছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবার এসএসসি পরীক্ষায় প্রায় ৬ লাখ ৯০ হাজার শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত ফলাফল পায়নি।
শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে আয়োজিত ‘চ্যালেঞ্জড স্টুডেন্টস কনভেনশন ২০২৬’-এ বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। গণস্বাক্ষরতা অভিযান ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ যৌথভাবে সম্মেলনটির আয়োজন করে।
মাহদী আমিন বলেন, এসএসসিতে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। একটি পরীক্ষার ফল দিয়ে কোনো শিক্ষার্থীর মেধা, যোগ্যতা ও সৃজনশীলতা বিচার করা যায় না। এসব শিক্ষার্থীকে উপযুক্ত সুযোগের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, যেসব শিক্ষার্থী কারিগরি ও ভোকেশনাল প্রশিক্ষণে আগ্রহী, তাদের নিজ নিজ এলাকার টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের (টিটিসি) সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা কর্মমুখী প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেদের দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ পাবে।
এ ছাড়া কোনো শিক্ষার্থীর ব্যবসায়িক উদ্ভাবনী ধারণা থাকলে তাকে ক্ষুদ্র পরিসরে ব্যবসা শুরু করার জন্য প্রাথমিক তহবিল দেওয়ার বিষয়টিও পরিকল্পনায় রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের উপযোগী করে তুলতে তিন থেকে ছয় মাসের স্বল্পমেয়াদি ভাষা প্রশিক্ষণের পরিকল্পনার কথাও জানান শিক্ষা উপদেষ্টা।
এ কর্মসূচিতে জাপানি, কোরীয়, চীনা ও ইউরোপীয় ভাষা শেখার সুযোগ রাখার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির লক্ষ্য রয়েছে।
তবে এসব কর্মসূচির বাস্তবায়ন, প্রশিক্ষণকেন্দ্র নির্বাচন, অর্থায়ন এবং কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা সম্পর্কে বিস্তারিত পরিকল্পনা চূড়ান্ত হলে তা আরও স্পষ্ট হবে।
এসএসসিতে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের পরবর্তী পরীক্ষার জন্য এক বছর অপেক্ষা না করিয়ে তিন মাসের মধ্যে পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাবও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, শিক্ষক ও অভিভাবকদের পক্ষ থেকে এক বছরের পরিবর্তে তিন মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে পরিবর্তন আনার ব্যাপারে সরকার আশাবাদী বলেও জানান তিনি।
তবে তিন মাসের মধ্যে পুনঃপরীক্ষা নেওয়ার বিষয়টি এখনো বিবেচনাধীন। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, পরীক্ষার সময়সূচি ও সংশ্লিষ্ট নিয়মাবলি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হলে শিক্ষার্থীরা বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারবেন।
শিক্ষা সংস্কারের অংশ হিসেবে পূর্ণাঙ্গ খাতা পুনঃনিরীক্ষণ চালু করা হয়েছে বলে জানান শিক্ষা উপদেষ্টা। তাঁর মতে, পরীক্ষায় খারাপ ফলের পেছনে কেবল শিক্ষার্থীর মেধা বা প্রস্তুতির ঘাটতিই দায়ী নয়; আর্থিক অসচ্ছলতা, শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষের সংকট কিংবা পরীক্ষার আগে পারিবারিক সমস্যাও ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
এসব সমস্যা বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
এসএসসিতে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে মাহদী আমিন বলেন, একটি পরীক্ষায় খারাপ করা মানেই জীবনে ব্যর্থ হওয়া নয়। সার্টিফিকেট দিয়ে মানুষের সামগ্রিক যোগ্যতা বিচার করা যায় না। একটি বিষয়ে অকৃতকার্য হওয়ার কারণে কারও মেধা ও সৃজনশীলতা শেষ হয়ে যায় না।
তিনি বলেন, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে না পারলে উন্নয়নের সুফল অর্থবহ হবে না। তাই শিক্ষার্থীদের বিকল্প শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরীর সভাপতিত্বে সম্মেলনে গণস্বাক্ষরতা অভিযান কাউন্সিলের চেয়ারপারসন ড. ইরাম মরিয়ম, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর কবিতা বোস এবং ডা. আরিফুর রহমান বক্তব্য দেন।
সরকারের প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এসএসসিতে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া শিক্ষার্থীদের সামনে প্রচলিত শিক্ষাধারার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের নতুন পথ তৈরি হতে পারে। তবে পরিকল্পনার সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের সময়সীমা, প্রশিক্ষণের মান, আর্থিক সহায়তার পরিধি এবং শিক্ষার্থীদের জন্য কার্যকর সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর।
মন্তব্য করুন